আইনি সুরক্ষার অন্যতম প্রাথমিক ধাপ সাধারণ ডায়েরি (জিডি), কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকেই প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। অন্যের স্বামী পরিচয় দিয়ে ভুয়া জিডি করার অভিযোগে শাহিদুল নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে চান্দগাঁও থানা পুলিশ। এ ঘটনাটি একদিকে যেমন আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নেয়ার অপচেষ্টাকে সামনে এনেছে, তেমনই অন্যদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে অপরাধী শনাক্তকরণের কার্যকারিতাও প্রমাণ করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে এবং প্রতারণার মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২৪ আগস্ট। থানা সূত্রে জানা যায়, ওই দিন শাহিদুল নামের এক ব্যক্তি চান্দগাঁও থানায় উপস্থিত হয়ে নিজেকে তাহেরা বেগম নামে এক নারীর স্বামী হিসেবে পরিচয় দেন এবং একটি জিডি নথিভুক্ত করেন (জিডি নং- ১৬৯৩)। বাহ্যিকভাবে প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক মনে হওয়ায় ডিউটি অফিসার জিডিটি গ্রহণ করেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে এর পরের ধাপেই। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, জিডি নথিভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই অভিযোগকারীর দেওয়া মোবাইল নম্বরে থানা থেকে একটি স্বয়ংক্রিয় নিশ্চিতকরণ বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে জিডিতে তাহেরা বেগমের নম্বরটিই ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রতারকদের অজান্তেই এই প্রযুক্তিগত ধাপটি তাদের ফাঁদে পরিণত হয়। তাহেরা বেগম তার মোবাইলে জিডির বার্তাটি পেয়ে হতবাক হয়ে যান। তিনি দ্রুত থানায় ফোন করে জানান যে, তিনি এ ধরনের কোনো জিডি করেননি এবং শাহিদুল নামের ওই ব্যক্তি তার স্বামী নন। এই একটি ফোনেই পুরো জালিয়াতির চিত্রটি পাল্টে যায়।
তাহেরা বেগমের অভিযোগ পেয়ে চান্দগাঁও থানার কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে জিডির সত্যতা যাচাইয়ে নামেন। কৌশলের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত শাহিদুলকে জিডির কাগজে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য থানায় আসতে বলা হয়। থানায় উপস্থিত হওয়ার পর স্বাক্ষর দিতে বলা হলে তিনি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার আচরণ ও কথায় অসংলগ্নতা থাকায় পুলিশের সন্দেহ ঘনীভূত হয়। এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
থানার ইনকোয়ারি অফিসার রাশেদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহিদুল ভেঙে পড়েন। তিনি স্বীকার করেন যে, প্রতারণার উদ্দেশ্যেই অন্যের নির্দেশে তিনি এ কাজ করেছেন। তবে কে বা কারা তাকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।
এ বিষয়ে রাশেদুল ইসলাম দৈনিক আজকের বাংলাকে বলেন, “এটি আইনি প্রক্রিয়ার গুরুতর অপব্যবহার। জিডির মতো একটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে এ ধরনের জালিয়াতি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আটক ব্যক্তির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪১৯ (অপরের রূপ ধারণপূর্বক প্রতারণা) এবং ১৮২ (কর্তব্য পালনে বাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে সরকারি কর্মচারীকে মিথ্যা তথ্য প্রদান) ধারায় মামলা করা হয়েছে।”
এদিকে তাহেরা বেগম দৈনিক আজকের বাংলাকে বলেন, এই ধরনের হয়রানি দেশের আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের নামান্তর। এই হয়রানি আমাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমি এক ধরনের ট্রমায় পড়ে গেছি। আমার মত আরো কত মানুষ যে এভাবে প্রতারণার স্বীকার কে জানে। পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ব্যক্তিগত শত্রুতা, সম্পত্তিগত বিরোধ কিংবা কোনো পক্ষকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন বা আইনিভাবে ফাঁসানোর জন্য এই প্রতারণার ছক কষা হতে পারে। একটি জিডিকে ভিত্তি করে পরবর্তীতে বড় ধরনের মামলা বা হয়রানির সুযোগ থাকে, সম্ভবত সেই উদ্দেশ্যই ছিল পরিকল্পনাকারীদের। এই ঘটনা প্রমাণ করে, জিডি গ্রহণের সময় পরিচয় যাচাইয়ে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কীভাবে অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে, এটি তার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। বর্তমানে আটক শাহিদুলকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে এবং পুলিশ প্রতারণার পেছনের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে তৎপর রয়েছে।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন