আসন্ন জাতীয় বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্প খাতের শ্রমিকদের জন্য রেশনিং বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। মঙ্গলবার (২০ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে “শ্রমিকদের জন্য কেমন বাজেট চাই” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই দাবি তুলে ধরেন তারা। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে শ্রমিকদের রেশনিং ও আবাসনের দাবি বাংলাদেশের শ্রমজীবী জনগণের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উপেক্ষার প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর থেকে বাজেটের বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটলেও শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ও জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত হয়নি। বরং চরম বৈষম্য দিন দিন প্রকট হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে এখনো রেশনিং ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের অস্থিরতা শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে শ্রমিক শ্রেণি শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সামাজিক নিরাপত্তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
একইভাবে, সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব শ্রমিকদের মানবেতর জীবনে বাধ্য করছে, যা একদিকে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে রেশনিং ও আবাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের একটি পরীক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, “জাতীয় বাজেটে শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকদের জন্য কোনো নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দ নেই। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু সে চুক্তির বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি। কোনো সরকারই এখনো পর্যন্ত রেশনিং ব্যবস্থা চালুসহ শ্রমবান্ধব নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং ব্যাপকভাবে বেড়েছে আয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সম্পদ ও খাদ্য বৈষম্য।”
বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বিশ্ববাজারে গার্মেন্টস শিল্পকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শ্রমিকদের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। এতে শ্রমিক, মালিক ও জাতি—সবারই উপকার হবে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দে যে বৈষম্য রয়েছে, তার একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র হলো-শ্রম মন্ত্রণালয় যে বাজেট পায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে সেই বাজেট থেকে শ্রমিকদের জন্য প্রতি ১০০ টাকায় বরাদ্দ ছিল ১১ পয়সা, যা বর্তমানে কমে ৯ পয়সায় এসে ঠেকেছে। বরাদ্দ দিন দিন কমছে, এটাই বাস্তবতা।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে ২০ লাখ নতুন বেকার তৈরি হয়েছে। এটি যেমন সরকারের জন্য অস্বস্তির, তেমনি শ্রমজীবী মানুষের জন্যও গভীর চিন্তার কারণ। সরকার চাইলে এই পরিস্থিতিতে বেকার ভাতা চালু করতে পারে, যা শ্রমিক শ্রেণির জন্য এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।”
শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, “একটি শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন, অথচ শ্রমিকদের জীবন ও কাজের পরিবেশ কার্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এটি কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়—এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর ও উদ্বেগজনক রহস্য। সেখানে শ্রমিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কোনো কার্যকর সম্পর্ক নেই, বরং এসব কমিটির সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, যা শ্রমিকদের প্রকৃত অধিকার রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক, গবেষক ও গার্মেন্টস মালিকরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম এবং ৭১ টেলিভিশনের সিনিয়র বিজনেস এডিটর কাজী আজিজুল ইসলাম।
এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সভাপতি মো. তৌহিদুর রহমান, ঢাকা লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট শারমিন সুলতানা মৌসুমি, জাতীয়তাবাদী গার্মেন্টস শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক লুৎফুর নাহার লতা, গার্মেন্টস শ্রমিক টিইউসির সহ-সভাপতি জলি তালুকদার, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এ.এ.এম. ফয়েজুর রহমান, সোনারগাঁও হোটেল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল চন্দ্র মজুমদার, এনসিপি শ্রমিক উইংয়ের সমন্বয়কারী মাজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ শ্রমিক অধিকার পরিষদের সভাপতি মো. আবদুর রহমান এবং বাংলাদেশ মোটরযান মেকানিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন।
আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রাইড-শেয়ারিং ড্রাইভারস ইউনিয়ন (ডিআরডিইউ)-এর সভাপতি আনিছুল হক রাসেল, আউটসোর্সিং শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বাবু, বাংলাদেশ শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শামীম ইমাম এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন।
বক্তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় শ্রমিকদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আবাসনের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, শ্রমিকদের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দের ধারা চালু করতে এবং রেশনিং ব্যবস্থা ও সাশ্রয়ী আবাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে। উল্লেখ্য আগামী ১লা জুন শ্রম মন্ত্রণালয়ের সামনে রেশনিং ও আবাসন নিশ্চিতকরণের দাবিতে শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছেন।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন