কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, বালু সিন্ডিকেট ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির স্থানীয় নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এবং তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
রবিবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর প্রেসক্লাবে মুরাদনগরের ছাত্র-জনতার ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি জানানো হয়। তাছাড়া, কায়কোবাদ যেন মুরাদনগরে আওয়ামী লীগের হুবহু প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, মুরাদনগর উপজেলা এনসিপির সভাপতি মিনহাজুল হক মিনহাজ, এনসিপি মুরাদনগর এনসিপির উপদেষ্টা জাহের মুন্সি, বাংগরা থানা এনসিপির সভাপতি কামরুল হাছান কেনাল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এডভোকেট উবাইদুল হক সিদ্দিকীসহ আরোও অনেকে বক্তব্য রাখেন। এসময় মুরাদনগরে চাঁদাবাজির শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগীও বক্তব্য প্রদান করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তারা বিএনপির স্থানীয় নেতা কায়কোবাদের কিছু ‘অপকর্ম’ তুলে ধরেন এবং প্রশাসনের কাছে কিছু দাবি পেশ করেন। মুরাদনগর উপজেলায় কায়কোবাদ ও তার অনুসারীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন ‘অপকর্ম’ তুলে ধরে তারা বলেন,
১. থানায় সন্ত্রাসী হামলা : গত ২৪ মার্চ মুরাদনগর থানা থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া শ্রমিক দলের নেতা আবুল কালামকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিতে থানায় হামলা চালানো হয়। এ হামলার নেতৃত্ব দেন কায়কোবাদ অনুসারী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসীরা সরাসরি থানায় হামলা চালায়।
২. প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীর ওপর হামলা : মুরাদনগর বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন অঞ্জনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে দিবালোকে ৭নং পশ্চিম বাংগরা ইউনিয়নের দীঘিরপার গ্রামের ব্যবসায়ী এনামুল হাছানের ওপর হামলা চালায়। তাকে গুরুতর আহত করার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার ভাঙচুর করা হয়।
৩. চাঁদাবাজির অভিযোগ ও অগ্নিসংযোগ : ১নং শ্রীকাইল ইউনিয়নে কায়কোবাদ নেতৃত্বাধীন একটি চক্র ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় শ্রীকাইল ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মেম্বার আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মুরাদনগর বিএনপি নেতা মহিউদ্দিন অঞ্জন।
৪. ফসলি জমিতে ড্রেজার দিয়ে মাটি ক্ষয় : শ্রীকাইল ইউনিয়নের চুড়ুলিয়া গ্রামে ড্রেজার মেশিন চালিয়ে ফসলি জমির মাটি নষ্ট করছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা। এই কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের রাসেল, যুবদলের সারোয়ার এবং যুবদল নেতা আক্তার হোসেন।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা : কায়কোবাদের ভাই জুন্নুকে কলেজ সভাপতি হিসেবে না করায় কায়কোবাদ নিজে নির্দেশ দিয়ে বাশকাইট রফিকুল ইসলাম মিয়া ডিগ্রি কলেজে ভাঙচুর চালান।
6. দলের নাম ব্যবহার করে পুনর্বাসনের নামে অপকর্ম : কায়কোবাদের নির্দেশে মুরাদনগর বিএনপি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাংগরা থানার রামচন্দ্রপুর বাজার ও আশেপাশের এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন মোল্লা মহিউদ্দিন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাইমুর রুহমানের আত্মীয় পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছেন।
৭. ভুয়া দলিল দিয়ে জমি দখলের চেষ্টা : মুরাদনগর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক খাইরুল, কায়কোবাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত, বাখরনগর গ্রামের প্রকৃত মালিক মোসলেম মিয়ার বসতভিটা জাল দলিলের মাধ্যমে জোরপূর্বক দখল করতে উদ্যত হন।
এসময় তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণসহ ৫টি দাবি জানান। দাবিগুলো হলো –
১. চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক কারবার ও বালু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জরুরি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. আওয়ামী লীগের পুরনো দুর্নীতিবাজ ও অপরাধী চক্রকে পুনর্বাসনের চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে।
৪. মুরাদনগরে সকল প্রকার গুম, হয়রানি, মিথ্যা মামলা ও দমনমূলক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
৫. একটি গণস্বার্থভিত্তিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক মুরাদনগর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুরাদনগরে সকল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিবর্গকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা বলেন, গত দেড় দশকজুড়ে বাংলাদেশ একটি ভয়ংকর ও নিপীড়নমূলক ফ্যাসিবাদী শাসনের কবলে পড়েছিল। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বিরোধী মতকে দমন করেছে, গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করেছে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা এবং অর্থ পাচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেছে। মুরাদনগরেও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, বালু সিন্ডিকেট ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পূর্বের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
তারা বলেন, কায়কোবাদ ও তার অনুসারীরা ইতোমধ্যে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদী অবস্থানের মুখে থানায় পর্যন্ত হামলা চালিয়েছে। আজ মুরাদনগরের মানুষ কায়কোবাদের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী চক্র, দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্যে চরম অতিষ্ঠ। গণঅভ্যুত্থানের যে আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল- তা যেন চরমভাবে পদদলিত হয়েছে এই কায়েকোবাদি রাজনীতির দ্বারা।
এমনকি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের পুনর্বাসনের পেছনেও কায়কোবাদ এবং তার অনুসারীদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। আজ মুরাদনগরে দেখা যাচ্ছে, যেসব আওয়ামী নেতাকর্মীরা এতদিন ধরে দুঃশাসনের প্রতীক ছিলেন, তারা কায়কোবাদের ছত্রছায়ায় নতুন রূপে দাপটের সাথে ফিরে এসেছে। এর ফলাফল, একটি স্বাধীন-উন্নয়নশীল মুরাদনগরের স্বপ্ন আজ হুমকির মুখে।
মুরাদনগরে নব্য ফ্যসিবাদকে মেনে নেওয়া হবে না উল্লেখ করে তারা বলেন, মুরাদনগরবাসী নীরব নয়। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জনগণ বুক ঠুকে দাঁড়িয়েছে কায়কোবাদের স্বৈরতান্ত্রিক অপশাসনের বিরুদ্ধে। আজকের মুরাদনগর আর সেই পুরনো, ভীত-সন্ত্রস্ত মুরাদনগর নয়। যারা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা কায়কোবাদের নেতৃত্বাধীন মুরাদনগর বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের প্রতিষ্ঠিত নতুন ফ্যাসিবাদ তারা কখনোই মেনে নেবে না।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, মুরাদনগরের সাধারণ মানুষ-বিশেষ করে যুবসমাজ ও ছাত্র-জনতা-চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, মাদক কারবারি, বালু সিন্ডিকেট ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এখন আর চুপ থাকবে না। আমরা চাই একটি মুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং সুশাসনপূর্ণ মুরাদনগর। মুরাদনগরের সন্তানরা যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে বিদায় করেছে, তারা আজও যেকোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
উল্লেখিত দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, আমরা দীপ্ত কন্ঠে বলতে চাই, মুরাদনগরের ছাত্র-জনতা এখন জেগে উঠেছে- আর কোনো ষড়যন্ত্র, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও ফ্যাসিবাদী রাজনীতির জায়গা এখানে নেই। আমরা চাই অনতিবিলম্বে আমাদের এই দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করবেন যেন মুরাদনগরে আর কখনো এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার সুযোগ ও সাহস না পায়।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন